[email protected] ঢাকা | রবিবার, ২রা আগস্ট ২০২৬, ১৭ই শ্রাবণ ১৪৩৩
thecitybank.com

চাঁপাইনবাবগঞ্জে পদ্মার ভয়াল ভাঙন: বিলীন দুই শতাধিক ঘরবাড়ি, স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের কাজ শুরু শিগগিরই

নিজস্ব সংবাদদাতা:

প্রকাশিত:
১ আগষ্ট ২০২৬, ২৩:৩৯

ছবি: সংগ্রহীত

চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার পদ্মা নদীতীরবর্তী এলাকায় ভয়াবহ নদীভাঙনে গত এক মাসে প্রায় দুই শতাধিক বসতবাড়ি, শতাধিক বিঘা আবাদি জমি, আম ও বাঁশবাগানসহ অসংখ্য গাছপালা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে গমের চরসহ আশপাশের কয়েকটি গ্রাম।

ভাঙনের মুখে বসতভিটা হারিয়ে অনেক পরিবার নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ঘরবাড়ি সরিয়ে নিচ্ছে, আবার অনেকে শেষ সম্বল হারিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন। স্থানীয় জনগণের কাছে জানা গেছে, শিবগঞ্জ উপজেলার দুর্লভপুর ইউনিয়নে ভারতের গঙ্গা নদী বাংলাদেশে প্রবেশ করে পদ্মা নাম ধারণ করেছে। বর্ষা মৌসুমে ভারী বৃষ্টিপাত ও উজান থেকে নেমে আসা পানির কারণে নদীর প্রবল স্রোতে এবার ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে নদীভাঙন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ভারতের ফারাক্কা বাঁধের গেট খুলে দেওয়ার পর পদ্মার স্রোত আরও তীব্র হয়ে ওঠে এবং তখনই ভাঙনের মাত্রা বেড়ে যায়। তাদের ভাষ্য, আগে মূলত বন্যার সময় নদীভাঙন দেখা গেলেও এখন আষাঢ় থেকে ভাদ্র মাস পর্যন্ত দীর্ঘ সময় ধরে ভাঙন অব্যাহত থাকছে, যা নদীতীরের মানুষের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, পদ্মা নদীতীরবর্তী শিবগঞ্জ উপজেলার পাঁকা, দুর্লভপুর ও উজিরপুর ইউনিয়নে প্রায় ৫০ হাজার মানুষের বসবাস। চলমান ভাঙনের কারণে এসব এলাকার হাজারো মানুষ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মো. রকিবুল ইসলাম জানান, শিবগঞ্জ উপজেলার পদ্মা নদীর পূর্ব তীরে ভাঙন রোধে ৭৪৮ কোটি টাকার একটি স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ প্রকল্প অনুমোদন হয়েছে। দরপত্র প্রক্রিয়াও শেষ হয়েছে। আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু করবে। এছাড়া নদীর পশ্চিম তীরেও স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা ও প্রস্তাবনা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। পর্যায়ক্রমে পদ্মার দুই তীরেই স্থায়ী নদীশাসন কাজ বাস্তবায়নের মাধ্যমে মানুষের নিরাপদ বসবাস নিশ্চিত করা হবে বলে তিনি জানান।

স্থানীয়দের তথ্যমতে, গত পাঁচ বছরে পদ্মার ভয়াবহ ভাঙনে হাজারো পরিবারের বসতভিটা, ফসলি জমি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাট-বাজার, কবরস্থান ও ঈদগাহ নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। এ সময় অন্তত ৫০০ পরিবার এলাকা ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। শুধু পাঁকা ইউনিয়নেই প্রায় ১৫টি গ্রাম এবং প্রায় এক হাজার হেক্টর আবাদি জমি নদীগর্ভে হারিয়ে গেছে।

স্থানীয়দের দাবি, গত পাঁচ বছরে এ অঞ্চলের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২০০ কোটি টাকা। বর্তমানে ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে প্রায় ৫০টি সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র, একটি বিজিবি ক্যাম্প, একটি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র, চারটি হাট-বাজার, তিনটি কবরস্থান এবং কয়েক হাজার হেক্টর আবাদি জমি।

স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর নদীভাঙন প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে চলতি বর্ষা মৌসুমে পদ্মার গর্ভে আরও বিস্তীর্ণ এলাকা বিলীন হতে পারে। তাই স্থায়ী নদীশাসন প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসন এবং জরুরি সহায়তার দাবি জানিয়েছেন তারা।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী এস এম আহসান হাবীব বলেন, "শিবগঞ্জ উপজেলার পদ্মা নদীর পূর্ব তীরের ভয়াবহ ভাঙন রোধে ৭৪৮ কোটি টাকার একটি স্থায়ী নদীশাসন ও বাঁধ নির্মাণ প্রকল্প ইতোমধ্যে অনুমোদন পেয়েছে। প্রকল্পের দরপত্র কার্যক্রমও সম্পন্ন হয়েছে। আশা করছি, আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু করবে। একই সঙ্গে পদ্মা নদীর পশ্চিম তীর সংরক্ষণে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা ও প্রস্তাবনা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

পর্যায়ক্রমে নদীর উভয় তীরেই স্থায়ী নদীশাসনের কাজ বাস্তবায়নের মাধ্যমে ভাঙনকবলিত মানুষের জানমাল, বসতভিটা ও কৃষিজমি সুরক্ষা নিশ্চিত করা হবে। আমরা পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করছি এবং সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে কাজ করে যাচ্ছি। সরকারের আন্তরিক সহযোগিতায় স্থায়ী সমাধানের মাধ্যমে পদ্মাপাড়ের মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ লাঘব হবে বলে আমরা আশাবাদী।"

এনামুল হক নাসিম/আ.আ


মন্তব্য করুন:

সম্পর্কিত খবর