প্রকাশিত:
৩১ আগষ্ট ২০২৬, ১৫:৫৬
বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম স্থলবন্দর চাঁপাইনবাবগঞ্জের সোনামসজিদ এখন প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। বিগত চার বছর আগেও যে বন্দরে ফল, কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ, মসলা, মাছ, কসমোটিক্স, ভুট্টা ও ভুষিসহ নানান পণ্যের খালাস নিয়ে কর্মচাঞ্চল্য ছিল, সেখানে বর্তমানে পাথর ছাড়া অন্য কোনো পণ্য আমদানি এক প্রকার বন্ধই হয়ে গেছে। কাস্টমস কর্তৃপক্ষের অসহযোগিতা, অতিরিক্ত কড়াকড়ি, রাজস্ব শুল্ক বা ভ্যালুয়েশনের বৈষমতা এবং দীর্ঘদিনের অবকাঠামোগত সমস্যার কারণে ব্যবসায়ীরা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন এই বন্দর থেকে। এর ফলে বন্দরকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড তলানিতে ঠেকেছে; শত শত শ্রমিক বেকার হয়ে ঋণগ্রস্ত ও অসহায় জীবনযাপন করছেন, আর সরকার হারাচ্ছে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব।
সোনামসজিদ স্থলবন্দরের বর্তমান পরিস্থিতি ও ব্যবসায়ীদের সূত্রে জানা যায়, বন্দরটি ঝিমিয়ে পড়ার পেছনে প্রধান অন্তরায় কাস্টমসের নীতি ও সুযোগ-সুবিধার চরম অভাব।আমদানিকারকদের মতে, বন্দর পরিচালনা ও রাজস্ব আদায়ে ব্যবসায়ীদের সাথে নিয়মিত সমন্বয় বা মিটিং করা হয় না। অধিক রাজস্ব প্রদানকারী পণ্য যেমন—ফল ও জিরাসহ বিভিন্ন মসলাজাতীয় পণ্যের শুল্কায়ন নিয়ে ট্যাক্স ভ্যারিয়েন্ট ও অ্যাসেসমেন্ট ভ্যালু নিয়ে কাস্টমস জটিলতা তৈরি করছে। ফলে একই পণ্য অন্য বন্দরে সহজে খালাস হলেও সোনামসজিদে এসে ব্যবসায়ীরা চরম লোকসানের মুখে পড়ছেন। ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ না পেয়ে আমদানিকারকরা এখন হিলি বা ভোমরার মতো বিকল্প বন্দরের দিকে ঝুঁকে পড়ছেন।
এছাড়া বন্দর সংলগ্ন নিজস্ব কাস্টমস হাউস না থাকা এই সংকটের বড় একটি কারণ। বর্তমানে কোনো প্রশাসনিক ও রাজস্ব সংক্রান্ত জটিলতা তৈরি হলে ব্যবসায়ীদের ছুটতে হয় রাজশাহীতে । অন্যদিকে, সোনামসজিদের অনেক পরে বন্দর হিসেবে অনুমোদন পেয়েও ভোমরায় কাস্টমস হাউস স্থাপিত হওয়ায় সেখানে রাত ৮টা থেকে ১০টা পর্যন্ত বন্দর সচল থাকে এবং দিনদিন আমদানি বহুগুণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। অথচ সোনামসজিদে প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতার কারণে কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
তবে কাস্টমস কতৃপক্ষ বলছেন, ব্যাবসায়ীদের অসহোযোগিতা নয় বরং নজরদারি বেড়েছে। যারা সঠিক পন্থায় ও সঠিক ভাবে ব্যাবসা করতে চাই তাদের ব্যাবসা করতে কোন সমস্যা নাই। বর্তমানে এই স্থলবন্দরে ব্যাবসা বান্ধব পরিবেশ আছে।
আমদানিকার ও রিয়াদ ইন্টারন্যাশনালের প্রোপাইটার মিজান সাহেব বলেন, সোনামসজিদ স্থলবন্দরে পাথর ছাড়া আর কোন ব্যাবসা হচ্ছে না। পানামার ভিতর খালি পড়ে থাকে এখন আগের মতো সেরকম গাড়ি আসছে না। এখানে অনেক শ্রমিক কাজ করতো, গাড়ি না আসা বা থাকার কারণে শ্রমিকগুলোও এখন বসে আছে। অনেকে ঋণগ্রস্থ, অসহায় অবস্থায় জীবন পার করছে। তাই সরকারের কাছে আমাদের আবেদন সরকার যেন আমাদের এই বন্দরটার দিকে তাকাই, একটু নজর দেয়। যাতে করে আমরা আবার আগের মতোই গতিশীল করতে পারি। সম্ভাবনা অবশ্যই আছে। সরকার যদি চাই, তাহলে সম্ভাবনা আছে, এখানে কোন কিছু বাধা নাই। সরকার যদি চেষ্টা করে তাহলে এই বন্দর আবারোও পুরানো রুপ ফিরে পাবে।
মের্সাস তুহিন ইন্টারপ্রাইজ এর প্রোপাইটার তুহিন আলম বলেন, সোনামসজিদ স্থলবন্দরে আগের মতো ব্যাবসা বান্ধব পরিবেশ নাই। আগে এই বন্দর দিয়ে ফল, মাছ, ভুষি, ভুট্টা, কসমেটিকস ও মসলা জাতীয় পণ্য আমদানি হতো। বর্তমানে সোনামসজিদ স্থলবন্দরে কোন সুযোগ সুবিধা না থাকা, আমদানিকারকদের সাথে কাস্টমস হাউজের কোন মিটিং না হওয়া এবং সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে দেখভাল না করার কারণে বন্দরটি ঝিমিয়ে গেছে। আসলে আমাদের এখানে কাস্টমস হাউস নাই এবং ব্যাবসায়ীর সুযোগ সুবিধা না পাওয়ার কারণে অন্য বন্দরমুখী হয়ে যাচ্ছে। আমরা এখানে সুযোগ সুবিধা না পাওয়ার কারণে হিলি বা ভোমরা বন্দর মুখি হয়ে যাচ্ছি। এর ফলে এই বন্দর রাজস্ব হারাচ্ছে। তাই আমরা জোর দাবি জানাচ্ছি আমাদের এখানে একটা কাস্টমস হাউসের দরকার কারণ পোর্ট কেন্দ্রীক কোন সমস্যা হলে আমাদেরকে রাজশাহী যাওয়া লাগে। কিন্ত দেখেন ভোমরা সোনামসজিদের অনেক পরে বন্দর হয়েছে কিন্ত সেখানে কাস্টমস হাউজ হয়ে যাওয়ার কারণে রাত ৮টা বা ১০ টা পর্যন্ত তাদের পোর্ট খোলা থাকে। কাস্টমস হাউজ থাকার কারণে তাদের দু:খ দুর্শার কথাগুলো বলতে পারে। যার কারণে সোনামসজিদ স্থলবন্দরের ব্যাবসাগুলো অনান্য পোর্টে ভাগ হয়ে যাচ্ছে।
সোনামসজিদ স্থলবন্দরের আমাদানি ও রপ্তানি কারক গ্রুপের সাংগঠনিক সম্পাদক জাকির হোসেন বলেন, সোনমসজিদ স্থলবন্দরে আমদানি রপ্তানি স্থবির হয়ে আছে। গতিশীল অনেক কম। যার কারণে এখানে যেমন ব্যাবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে, তেমনই শ্রমিক থেকে শুরু করে অনেকে এই বন্দরে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। তাই সরকারের কাছে দাবি জানাবো এই বন্দরকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য সরকার যেন এই বন্দরে সুযোগ সুবিধা দেয় যাতে করে সরকারের রেভিনিউ কালেকশন বেশি হয়। আমরা ব্যাবসায়ীরা সরকারকে রেভিনিউ দেওয়ার জন্য প্রস্তত আছি। এছাড়া ফল, জিরাসহ মসলা জাতীয় পণ্য এই বন্দর দিয়ে আসা কমে গেছে। এই পণ্যগুলোতে রাজস্ব বেশি আদায় হয়। তার জন্য এই বন্দর দিয়ে রাজস্ব আসা কমে গেছে।
আরেক আমদানিকারক সাঈদ বলেন, সোনামসজিদ স্থলবন্দরের বর্তমান অবস্থা খুবই খারাপ। পাথর ছাড়া অন্য আইটেম আসছে না। কারণ হচ্ছে, ট্রাক্সের ভ্যারিয়েন্ট হয়ে যাচ্ছে, ভ্যালু নির্ধারণের ক্ষেত্রে সমস্যা হচ্ছে। এটা কাস্টমস ভালোভাবে দেখছে না। একজন আমদানি কারক যখন দেখবে ট্রাক্সের ভ্যারিয়েন্ট হয়ে যাচ্ছে তখন অন্য জায়গায় সেল দিতে পারবে না। এছাড়া এই বন্দরে রাজস্ব ঘাটতির প্রধান কারণ হচ্ছে কাস্টমস। কাস্টমস যদি এইরকম ঝামেলা না করে, বরং অনান্য পোর্টের মতো যদি সুযোগ সুবিধা দেয় তাহলে অনান্য পণ্য আমদানি বেড়ে যাবে। তাই এই বিষয়ে অবশ্যই সরকারকে নজর দেওয়া দরকার। কেন কাস্টমস এইকাজগুলো করছে, অন্য পোর্টগুলো যেভাবে চলছে এই পোর্ট সেইভাবে চলছে না কেন? এটা অবশ্যই তদন্ত করে দেখা দরকার। তাছাড়াও পোর্টকে আরোও ক্রিয়াশীল করতে হলে অবশ্যই কাস্টমস হাউজ লাগবে। আমাদের সোনামসজিদ স্থলবন্দর দ্বিতীয় স্থলবন্দর। কিন্ত আমরা এখন পর্যন্ত কাস্টমস হাউজ পাই নি। ভোমরা আমাদের পরের পোর্ট তারপরও ভোমরাতে কাস্টমস হাউজ পেয়ে গেছে। ভোমরাতে কাস্টমস হাউজ হওয়ার কারণে ভোমরাতে গাড়ি চারগুন মতো বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই আমাদের সোনামসজিদ স্থলবন্দরে কাস্টমস হাউজ হলে অবশ্যই গাড়ি চার বা পাঁচ গুণ বেড়ে যাবে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি এর সভাপতি আব্দুল ওয়াহেদ বলেন, সোনামসজিদ স্থলবন্দর রেভিনিউ কালেকশন এর দিক দিয়ে বেনাপুলের পরে দ্বিতীয় স্থলবন্দর ছিল। ভৌগলিক ও নেতৃবৃন্দের কারণে সোনামসজিদ স্থলবন্দরের রেভিনিউটা কম হয়ে যাচ্ছে। এটা ব্যর্থ হওয়ার দিকে যাচ্ছে। ব্যথ হওয়ার কারণ হচ্ছে সোনামসজিদ এলাকায় কাস্টমসের আবাসন ব্যাবস্থা না থাকা। কাস্টমস এর কর্মকর্তারা শিবগঞ্জ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহী থেকে যাওয়া আসা করে। আমাদের আন্তজার্তিক নিয়ম অনুসারে সূর্যদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পোর্ট চালু থাকবে। কিন্ত এখানে অফিসাররা আসে ৯টা, ১০টা বা ১১ টার সময়ে আবার ৪টার পরে যাওয়ার জন্য প্রস্ততি নেয় রাস্তায় যাওয়ার নিরপত্তা জনিত কারণে। তারা তাড়াতাড়ি যাওয়ার চেষ্টা করে। এটি এক নাম্বার সমস্যা। দ্বিতীয় সমস্যা হচ্ছে, অনান্য পোর্টে ফলের গাড়িতে ছাড় দিলেও এখানে কাস্টম সেটি ফলো করে না এবং অসহোযোগিতা করে। রাজশাহীতে কাস্টমস এর যে সেটাপ আছে এই সেটাপটি হচ্ছে সোনামসজিদ স্থলবন্দরে ব্যাবসা বাণিজ্য বিরোধী সেটাপ। এখানে সরকার একটা সীমান্ত বাণিজ্য কমিটি করে দিয়েছে। এই কমিটির দুই মাস পর পর মিটিং হওয়ার কথা, বন্দরের কি কি সমস্যা, ব্যাবসা বাণিজ্য বৃদ্ধিসহ সব ধরনের বিষয়গুলো আলোচনা করার জন্য। এই কাস্টমস কমিশনার রাজশাহী এইসব মিটিংগুলো ঠিকমতো করে না। তাই আমি মনে করি অনান্য বন্দরে যে সমস্ত সুযোগ সুবিধা আছে, এই বন্দরের সেগুলো দিতে হবে।
তিনি আরোও বলেন, কাস্টমস কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের থাকার যে আবাসন দরকার তার জন্য ৩২০ কোটি টাকার সাসেক নামের একটি প্রকল্প একনেকে আটকে আছে বা অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে, সেটি অনুমোদনের ব্যাবস্থা করতে হবে। সেটি অনুমোদন হলে সোনামসজিদের অবকাঠামোসহ কাস্টমস হাউসসহ সবকিছু এই প্রকল্পের মধ্যে হবে। যতক্ষণ পর্যন্ত এইগুলো তৈরি না হবে ততক্ষণ পর্যন্ত সোনামসজিদ স্থলবন্দরের রেভিনিউ কালেকশন বৃদ্ধি হবে না। এছাড়া বন্দরের দুই পাড়ের যে নেতৃত্ব সেই নেতৃত্ব দিয়ে সোনামসজিদ স্থলবন্দরকে এগিয়ে নেওয়া যাবে না। যারা অবৈধভাবে ব্যাবসা করার চেষ্টা করছে তাদেরকে এই পথ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে এবং বৈধ পথে যেন ব্যাবসা হয়ে সেটি দিকের খেয়াল রাখতে হবে। তাই বিজিবি, কাস্টমস, এনএসআই, ডিজিএফআই, আমদানিকারক, সিএন্ডএফসহ সকলকে একযোগে কাজ করতে হবে। তবেই সোনামসজিদ স্থলবন্দরের ব্যাবসা বাণিজ্য বৃদ্ধি করা সম্ভব।
সোনামসজিদ স্থলবন্দরের রাজস্ব কর্মকর্তা রাজু মিয়া বলেন, গত ২৫-২৬ অর্থবছরে আমাদের এখানে রাজস্ব আদায় হয়েছে ৮১৯ কোটি টাকা। ২৪-২৫ অর্থবছরে আদায় হয়েছিলো ৯০৯ কোটি টাকা। ব্যাবধান প্রায় ৯০ কোটি টাকা। শতকরা হিসেবে ৯ দশমিক ৮৭ শতাংশ রাজস্ব ঘটতি হয়েছে। রাজস্ব ঘাটতির অনেকগুলো কারণ এখানে কাজ করে। এই ক্ষেত্রে আমদনি যদি কমে যায় বা আমদানি শুল্ক কমে যাওয়াসহ নানান কারণে রাজস্ব ঘাটতি দেখা দিতে পারে। আগে এখানে বিভিন্ন ধরনের আইটেম আমাদানি হতো। বিভিন্ন কারণে কিছু কিছু পণ্য আমদানি কমে গেছে, যার কারণে রাজস্ব ঘাটতি হচ্ছে।
তিনি আরোও বলেন, ব্যাবসায়ীদের অসহোযোগিতা সেটা বলা যাবে না, তবে হ্যাঁ নজরদারি বেড়েছে সেটা ঠিক আছে। আমাদের কমিশনার মহাদয়ের নির্দেশনা হচ্ছে সঠিকভাবে সঠিক পন্থায় যারা ব্যাবসায়ী আছে তাদেরকে ওয়েলকাম তারা ব্যাবসা করবে। ভিন্ন পন্থায় যারা ব্যাবসা করতে চাই তাদের এই সুযোগ এখানে কমে গেছে। যার কারণে বলতে পারেন রেভিনিউতে ইম্প্যাক্ট পড়তে পারে। তবে বন্দরে এখন ব্যাবসা বান্ধব পরিবেশ আছে, সঠিক ভাবে সঠিক পন্থায় ব্যাবসায়ীরা ব্যাবসা করতে পারছে।
এম.এ.এ/আ.আ
মন্তব্য করুন: