প্রকাশিত:
১৫ সেপ্টেম্বার ২০২৬, ১০:৩১
ছেলে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফিরে আসবে—এই আশায় দিন গড়িয়েছে, মাস পেরিয়েছে, বছরও কেটে গেছে। দেখতে দেখতে কেটে গেছে দীর্ঘ ১৪টি বছর। কিন্তু সেই প্রতীক্ষার শেষ হয়নি। সন্তানের ফেরার অপেক্ষায় আজও পথ চেয়ে আছেন স্নেহময়ী বাবা অধ্যক্ষ মাওলানা ফজলুর রহমান ও মমতাময়ী মা আফিফা রহমান।
বলছিলাম কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতা মো. ওয়ালিউল্লাহর বাবা-মা। ২০১২ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকা থেকে কুষ্টিয়া যাওয়ার পথে সাভারের নবীনগর এলাকা থেকে র্যাব ও ডিবি পুলিশ পরিচয়ে তুলে নেওয়ার পর থেকে নিখোঁজ রয়েছেন ওয়ালিউল্লাহ। একই সময় তাঁর সঙ্গে থাকা তৎকালীন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের সাংস্কৃতিক সম্পাদক আল-মুকাদ্দাসকেও তুলে নেওয়া হয় বলে পরিবারের অভিযোগ। এরপর থেকে গত ১৪ বছরে তাঁদের আর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।
বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে করতে ওয়ালিউল্লাহর বৃদ্ধ বাবা-মা এখন প্রায় ভেঙে পড়েছেন। বাবা মাওলানা ফজলুর রহমানের ধারণা, ডিবি পুলিশ পরিচয়ে তুলে নেওয়া তাঁর ছেলে হয়তো আর জীবিত নেই। হয়তো কোনোদিনই আর ফিরে আসবে না সে। তারপরও বাবা-মায়ের মন মানতে চায় না। যদি কোনোদিন ফিরে আসে—এই আশাতেই বুক বেঁধে দিন কাটছে তাঁদের।
ওয়ালিউল্লাহর বাড়ি ঝালকাঠির কাঠালিয়া উপজেলার পশ্চিম শৌলজালিয়া গ্রামে। তিনি কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের দাওয়াহ অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের মেধাবী ছাত্র ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের অর্থ সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করতেন তিনি।
পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ওয়ালীউল্লাহ ও আল-মুকাদ্দাস ঢাকায় যান। পরে ৪ ফেব্রুয়ারি রাতে তাঁরা রাজধানীর কল্যাণপুর থেকে কুষ্টিয়ার উদ্দেশে হানিফ পরিবহনের একটি বাসে (নম্বর-৩৭৫০) ওঠেন। বাসটি রাত সাড়ে ১১টার দিকে কল্যাণপুর থেকে ছেড়ে যায়। রাত প্রায় ১টার দিকে বাসটি সাভারের নবীনগর এলাকায় পৌঁছালে একটি কালো গাড়ি বাসটির গতিরোধ করে। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, র্যাবের পোশাক পরিহিত ৮-১০ জন এবং সাদা পোশাকধারী কয়েকজন ব্যক্তি বাসে ওঠেন। তাঁরা নিজেদের র্যাব ও ডিবি পুলিশ পরিচয় দিয়ে ওয়ালীউল্লাহ ও আল-মুকাদ্দাসকে বাস থেকে নামিয়ে নিয়ে যান।
দুই তরুণ কোথায় আছেন, কী অবস্থায় আছেন, তাঁদের সঙ্গে কী ঘটেছে— গত ১৪ বছরেও তার কোনো উত্তর মেলেনি। তাঁরা বেঁচে আছেন নাকি মারা গেছেন, সেটিও জানে না পরিবার।
আল-মুকাদ্দাসের নিখোঁজের ঘটনায় ৬ ফেব্রুয়ারি তাঁর চাচা আবদুল হাই রাজধানীর দারুস সালাম থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। ওয়ালীউল্লাহর নিখোঁজের ঘটনায় ৮ ফেব্রুয়ারি তাঁর বড় ভাই খালেদ সাইফুল্লাহ আশুলিয়া থানায় জিডি করেন। এরপর নিখোঁজ দুই শিক্ষার্থীর পরিবার তাঁদের সন্ধান পেতে পুলিশ, র্যাবসহ প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। কিন্তু কোনো জায়গা থেকেই তাঁরা সন্তানের সন্ধান পাননি।
পরবর্তীতে নিখোঁজ দুই শিক্ষার্থীর সন্ধান চেয়ে তাঁদের পরিবার হাইকোর্টে পৃথক দুটি রিট পিটিশন করেন। তবে পরবর্তীতে রিট দুটিও খারিজ হয়ে যায়। সন্তানদের ফিরে পাওয়ার আশায় পরিবারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময় সংবাদ সম্মেলন ও মানববন্ধনও করা হয়। কিন্তু এত বছর পরও ওয়ালিউল্লাহ ও আল-মুকাদ্দাসের সন্ধান মেলেনি।
ওয়ালিউল্লাহর বাবা মাওলানা ফজলুর রহমান ঝালকাঠির কাঠালিয়া উপজেলার বলতলা কৈখালী সিনিয়র মাদরাসার সাবেক অধ্যক্ষ। দুই ছেলে ও পাঁচ মেয়ের মধ্যে ওয়ালিউল্লাহ ছিলেন পঞ্চম সন্তান। ছোটবেলা থেকেই অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন ওয়ালিউল্লাহ। প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরিয়ে উচ্চশিক্ষা লাভের আশায় ভর্তি হন কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের দাওয়াহ অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগে। অনার্স সম্পন্ন করে মাস্টার্সে অধ্যয়নরত ছিলেন তিনি। লেখাপড়ার পাশাপাশি বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের রাজনীতিতেও সক্রিয় ছিলেন। পরিবারের কাছে ওয়ালিউল্লাহ ছিলেন শুধু একজন মেধাবী শিক্ষার্থী নন, ছিলেন পরিবারের স্বপ্ন ও ভবিষ্যতের অন্যতম ভরসা। কিন্তু ২০১২ সালের সেই রাতের পর সবকিছু বদলে যায়।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে গত বছরের সেপ্টেম্বরে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আল-মুকাদ্দাস ও মো. ওয়ালীউল্লাহর নিখোঁজের ঘটনা তদন্তে একটি ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি গঠন করে। কমিটিতে ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধ্যাপক আব্দুল হান্নান শেখকে আহ্বায়ক এবং পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিভাগের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক মোয়াজ্জেম হোসেনকে সদস্যসচিব করা হয়। কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে অধ্যাপক আব্দুল হান্নান শেখ দুটি সভা করেন এবং প্রাথমিকভাবে কিছু কাজের খসড়াও প্রস্তুত করেন। তবে পরবর্তী সময়ে কমিটির অন্য সদস্যদের অসহযোগিতার অভিযোগ তুলে তিনি পদত্যাগ করেন।
তিনি বলেন, ‘কমিটির অন্য সদস্যরা অসহযোগিতা করায় আমি পদত্যাগ করি। তবে এ বিষয়ে প্রশাসন কোনো বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেনি এবং কমিটিও পুনর্গঠনও করেনি।’ ফলে প্রায় এক বছরেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কমিটি পুনর্গঠন বা নতুন কোনো উদ্যোগ না নেওয়ায় তদন্ত কার্যক্রম আর এগোয়নি।
দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে ভাইয়ের সন্ধানের অপেক্ষায় থাকা ওয়ালিউল্লাহর বড় ভাই খালিদ সাইফুল্লাহ এখন এসব নিয়ে কথা বলতেও ক্লান্ত। তিনি বলেন, ‘এখন এসব নিয়ে কথা বলতে আর ইচ্ছা হয় না। কথা বলতে বলতে, লিখতে লিখতে আমরা হয়রান হয়ে গেছি।’ সরকারের কাছে প্রত্যাশা করেও কোনো ফল পাওয়া যাবে কি না—এ নিয়েও হতাশা প্রকাশ করেন তিনি। খালিদ সাইফুল্লাহ প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘আপনার কী মনে হয় সরকার আসলে এসব ঘটনার বিচার করতে পারবে? এই ঘটনার সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জড়িত। সেখানে যারা এখনো কর্মরত, তারা কি তাদেরই বিচার করবে? আসলে এ দেশের প্রেক্ষাপটে এটি বিচারযোগ্য নয়। যারা গুম থেকে ফিরে এসেছে, তাদের ক্ষেত্রেও তো বিচার হয়নি।’
রাষ্ট্রীয় কোনো সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, তাঁদের সঙ্গে কারও যোগাযোগ হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ছাত্রশিবির তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তথ্য নিয়েছিল। তখন বিষয়টি নিয়ে নতুন করে কিছুটা আলাপ-আলোচনা হয়েছিল। তবে গুম কমিশন বা অন্য কোনো সংস্থা তাঁদের সঙ্গে কোনো ধরনের যোগাযোগ করেনি বলেও জানান তিনি।
এ বিষয়ে ঝালকাঠি জেলা জামায়াতের আমির অ্যাডভোকেট হাফিজুর রহমান বলেন, সাংগঠনিকভাবে মেধাবী হওয়ায় ক্যাম্পাসকে নেতৃত্বশূন্য করে তা দখলে নেওয়ার জন্য ওয়ালিউল্লাহকে গুম করা হয়। তিনি বলেন, এই ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের খুঁজে বের করে বিচারের আওতায় আনার জোর দাবি জানাচ্ছি।
ডেস্ক/আ.আ
মন্তব্য করুন: