[email protected] ঢাকা | রবিবার, ১৫ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২রা ফাল্গুন ১৪৩২
thecitybank.com

ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় একে-অপরকে দোষারোপ বিএনপি-জামায়াতের নেতাদের

নিজস্ব প্রতিনিধি:

প্রকাশিত:
১৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ২১:৪২

বামে সাবেক সংসদ সদস্য হারুনুর রশিদ, ডানে সাবেক সংসদ সদস্য লতিফুর রহমান। ছবি: সংগ্রহীত

চাঁপাইনবাবগঞ্জে ককটেল তৈরির সময় বিস্ফোরণে দুইজন নিহত ও তিনজন আহত হয়েছেন। শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) ভোর ৫টার দিকে সদর উপজেলার চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়নে এ ঘটনা ঘটে। তবে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে সাংবাদিকদের কাছে একে অপরের উপর দোষ চাপিয়েছেন বিএনপি ও জামায়াতের নেতারা।

প্রথমে ঘটনাস্থলে আসনে বিএনপির চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা ও সাবেক সংসদ সসদ্য হারুনুর রশিদ। এই সময় তার সাথে ছিলেন, বিএনপি নেতা নজরুল ইসলাম, চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ওমর আলী, সদর উপজেলা তাঁতী লীগের সভাপতি ও ইউপি সদস্য নুরুল ইসলামসহ প্রমুখ।

ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, গতকাল রাতে চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ও ইউপি সদস্য নাসির মেম্বারের বাড়িতে উত্তেজনা ও গন্ডগোল হয়েছিল। পরে আমি পুলিশকে জানালে তার ব্যাবস্থা গ্রহণ করেছিল। আজকে তাদের পরিকল্পনা ছিল এই ইউনিয়নে ব্যাপক গোলযোগ ও গোলমাল তৈরি করা। সে উদ্দেশ্য নিয়ে বাইরে অবস্থানকারী টিপু চেয়ারম্যান, সাবেক চেয়ারম্যান বুলবুলসহ আরোও বেশ কিছু সন্ত্রাসী বিএনপির নেতাকর্মীদের বাড়িতে হামলা, ভাঙ্চুর করার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলো। আল্লাহর রহমতে তারা নিজেরাই বোমা তৈরি করতে গিয়ে নিজেরাই বিস্ফোরিত হয়েছে। এখানে দুইজন মারা গেছে এবং তিনজন আহত হয়েছে। তাই আমি মনে করি এই ঘটনার সাথে যারা জড়িত যত দ্রুত সম্ভব তাদের বিরুদ্ধে ব্যাবস্থা নেওয়া হোক।

তিনি আরোও বলেন, নির্বাচনে যারা ধানের শীষের পক্ষে কাজ করেছে তাদেরকে আক্রমণ করার জন্য বা তাদের বাড়ি ঘরে আক্রমণ করার জন্যই তারা এই প্রস্ততিটি নিচ্ছিলো, প্রতিহিংসার বশিভূত হয়ে।

অপরদিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য লতিফুর রহমানের নেতৃত্বে জেলা জামায়াতের আমীর আবু জার গিফারী, সেক্রেটারি আবু বক্কর, নায়েবে আমীর মুখলেসুর রহমান, সদর উপজেলা আমীর হাফেজ আব্দুল আলীম ও পৌর আমীর হাফেজ গোলাম রাব্বানী ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।

ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে  সংবাদিকদের সাবেক এমপি লতিফুর রহমান হারুনের বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, সাবেক এমপি হারুনুর রশিদ সাহেব যে বক্তব্যটা দিয়েছেন এটা তিনি না দিলেই পারতেন। তিনি জামায়াত ইসলামীকে ডাইরেক্ট ইনভলব করেছেন, তদন্ত হওয়ার আগেই। তিনি একজন দায়িত্বশীল তাকে বুঝে শুনে কথা বলা উচিত। এজন্য তার এই বক্তব্যের প্রতিবাদ জানাচ্ছি। তার এই বক্তব্য উইডো করা উচিত।

তিনি আরোও বলেন, নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং এর ফলাফল আমরা মেনে নিয়েছি। এর পর এই ধরনের ঘটনা এটা দু:খজনক। এই ধরনের ঘটনা আমরা পছন্দ করি না। এটাই হচ্ছে মূল কথা। এটা কোন রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে ভাবে ঘটেনি এবং এটি একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা। আমরা পুলিশ প্রশাসনকে জানিয়ে দিয়েছি প্রপার ইনভেস্টগিশন করে আইনী ব্যাবস্থা নিতে হবে। কোন নির্দোষ ব্যাক্তিকে এরেস্ট করা যাবে না এবং মামলা দেওয়া যাবে না। যারা আসল দোষী তাদেরকে আইনের আওতায় নিয়ে আসতে হবে।

এলাকাবাসী ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়নের ফাটাপাড়ার মৃত মকবুল হোসেনের কালামের বাড়িতে চলছিল ককটেল তৈরির কাজ।  এই ককটেল তৈরি করার জন্য এলাকার বাইরে থেকে কারিগর নিয়ে এসেছিল কালামের ছোট ভাই দুলাল (৪০)। দুলাল মূলত কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত।  তার বংশের লোকজনও আওয়ামী লীগের রাজনীতি করে। এছাড়াও দুলাল সীমান্ত এলাকার চিহ্নিত মাদক ব্যাবসায়ী এবং একাধিক মামলার আসামি।

এলাকাবাসী সূত্রে আরোও জানা যায়, সীমান্তবর্তী চরবাগডাঙ্গা এলাকায় দলীয় রাজনীতির চেয়ে ভিলেজ পলিটিক্স এবং গ্রুপিং রাজনীতি বেশি চাঙ্গা। আধিপত্য বিস্তার, মাদক সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণসহ নানান কারণে  চরবাগডাঙ্গায় দলীয় রাজনীতির বাইরে মোটা দাগে দুই ভাগে গ্রুপিং রাজনীতি বিভক্ত। এক গ্রুপের নেতৃত্ব দেন ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ওমর আলী এবং অপর গ্রুপের নেতৃত্ব দেন চরবাগডাঙ্গার বহিষ্কৃত চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা  শহীদ রানা টিপু।  আর দুলাল মূলত টিপু চেয়ারম্যানের গ্রুপের লোক। দুলালের বিপরীত আওয়ামী লীগের গ্রুপটি বিএনপির প্রার্থী হারুনুর রশিদের নির্বাচনে সক্রিয় কাজ শুরু করলে নিজের আধিপত্য বিস্তার ও মাদক সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য দুলালও নির্বাচনের কয়েকদিন আগে থেকে জামায়াতের প্রার্থী নুরুল ইসলাম বুলবুলের পক্ষে তোড়জোড় কাজ শুরু করেন। এরপর নির্বাচনে জামায়াতের প্রার্থী নুরুল ইসলাম বুলবুল বিপুল ভোটে জয় লাভ করেন। নির্বাচনে জয়লাভের পর দুলাল এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের জন্যই বাইরে থেকে কারিগর নিয়ে এসে ককটেল তৈরি করছিল বলে জানা গেছে।

প্রসঙ্গত, শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) ভোর আনুমানিক ৫টার দিকে ফাঁটাপাড়া গ্রামের মৃত মকবুল হোসেনের ছেলে মো. কালামের বসতবাড়িতে একদল দুষ্কৃতকারি ককটেল তৈরির সরঞ্জামসহ অবস্থান করছিল। সেখানে তারা ককটেল তৈরি করার সময় হঠাৎ বিস্ফোরণ ঘটে। বিস্ফোরণের তীব্রতা এতই বেশি ছিল যে ঘটনাস্থলেই আলামিন ও জিহাদ নামের দুইজন প্রাণ হারান।

এছাড়াও বিস্ফোরণে গুরুতর জখম হওয়া তিনজনকে স্থানীয়রা উদ্ধার করে দ্রুত চাঁপাইনবাবগঞ্জ আধুনিক সদর হাসপাতালে নিয়ে যান। পরে হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর তাদের শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।

নিহতরা হলেন, সদর উপজেলার রাণিহাটি ইউনিয়নের ওপর ধুমিহায়াতপুর এলাকার মোয়াজ্জেমের ছেলে আলামিন (২০) এবং শিবগঞ্জ উপজেলার ঘোড়াপাখিয়া ইউনিয়নের মনিরুল ইসলামের ছেলে জিহাদ (১৭)। এছাড়া আহত তিনজন হলেন, সদর উপজেলার চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়নের ফাঁটাপাড়া গ্রামের মো. বজলুর রহমান (২০) ও মো. মিনহাজ (২২) এবং একই উপজেলার রাণিহাটি ইউনিয়নের উপরধুমি এলাকার মো. শুভ (২০)। আহত বজলুর রহমান ও মিনহাজ হলো ককটেল তৈরির মূলহোতা দুলালের চাচা ও ভাতিজা।

এম.এ.এ/আ.আ


মন্তব্য করুন:

সম্পর্কিত খবর