প্রকাশিত:
২৮ অক্টোবার ২০২৬, ১৯:৫৬
আগামীকাল বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টেবর) ঠাকুরগাঁও-১ আসনের নির্বাচন সুষ্ঠু না হলে সারাদেশে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়বে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও ১১-দলীয় জোটের সমন্বয়ক এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিনের সঙ্গে বৈঠক শেষে এ হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন তিনি।
হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, ১১টি দল আমরা আছি। আমাদের দুটি ইস্যু- ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচন ও আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন। আগামীকাল ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচন। আমরা সেখানে গিয়ে কিছু পর্যবেক্ষণ করে এসে কমিশনে অভিযোগ দিয়েছিলাম। আজ কমিশন সেসব অভিযোগের বিষয়ে কিছু কিছু পদক্ষেপ নিলেও অনেক ক্ষেত্রেই কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
তিনি বলেন, আমরা ইউএনওকে সরাতে বলেছিলাম। কিন্তু তাকে সরানো হয়নি। তাকে সরিয়ে না দিয়ে নির্বাচন কার্যক্রম থেকে বিরত রেখেছে নির্বাচন কমিশন। কিন্তু আমরা বলেছি, তাকে প্রত্যাহার করতেই হবে এবং তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। নির্বাচন কার্যক্রম থেকে বিরত রেখে আইওয়াশ করতে চান- আমরা সেই প্রশ্ন করেছি।
তিনি বলেন, আগামীকালের নির্বাচন নিরপেক্ষ না হলে আমরা বলব, কমিশন আইওয়াশ করেছে। আগামীকালের নির্বাচনই নির্ধারণ করবে, আমরা স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণ করব কি না। নির্বাচন সুষ্ঠু না হলে সারাদেশে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়বে বলে হুঁশিয়ার করেন জামায়াত নেতা হামিদুর রহমান আযাদ।
ঠাকুরগাঁওয়ে নির্বাচনী প্রচার কার্যক্রমে বাধা, হামলা ও সন্ত্রাসের অভিযোগ তুলে হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ঘটনার তথ্যও কমিশনে দেওয়া হয়েছে। কে কাকে আঘাত করেছে, কখন, কোন দিন, কোন রাতে এবং কোথায় ঘটনা ঘটেছে- এসব তথ্য সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। হামলাকারীদের নাম ও আহত ব্যক্তিদের তালিকাও লিখিতভাবে জমা দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, এসব অভিযোগের বিষয়ে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তা তারা এখনো জানতে পারেননি। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কারণে ভোটারদের মধ্যে ভয়ভীতি ছড়িয়ে পড়ছে বলে তারা মনে করছেন। বিশেষ করে হিন্দু ভোটারদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জামায়াতে ইসলামীর এই নেতা। তথ্যমতে, ঠাকুরগাঁও-১ আসনে প্রায় ১ লাখ ৬৮ হাজার হিন্দু ভোটার রয়েছেন। তাদের ওপর হুমকি-ধমকি ও মারধরের ঘটনা ঘটছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ অবস্থায় সবার ভোটাধিকার নিশ্চিত করা নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব।
তিনি আরও বলেন, সংবিধানের সপ্তম ভাগে ১১৮ থেকে ১২৬ অনুচ্ছেদে নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব ও সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো উল্লেখ রয়েছে। সেই সাংবিধানিক দায়িত্ব কার্যকরভাবে পালনের জন্য কমিশনকে বাস্তব পদক্ষেপ নিতে হবে।
হামিদুর রহমান আযাদ জানান, ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচন সামনে রেখে তারা চারটি প্রধান দাবি জানিয়েছেন। প্রথম দাবি, নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েন করতে হবে। কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পর্যাপ্ত সদস্য রয়েছেন। বিজিবি, পুলিশ ও অন্যান্য বাহিনীও দায়িত্ব পালন করছে। তবে এসব বাহিনীর অতীত ভূমিকা এবং সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলোতে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিয়ে তাদের ওপর আস্থার ঘাটতি রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
তিনি বলেন, তুলনামূলকভাবে সেনাবাহিনীর ওপর মানুষের আস্থা এখনো রয়েছে। সেনাবাহিনী মাঠে থাকলে ভোটাররা নির্ভয়ে কেন্দ্রে যেতে এবং নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন বলে তারা মনে করেন। এ কারণে আবারও সেনা মোতায়েনের দাবি জানানো হয়েছে।
দ্বিতীয় দাবি, সদর উপজেলার ইউএনও খায়রুল ইসলামকে নির্বাচনের আগেই প্রত্যাহার করতে হবে এবং তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত করতে হবে।
তৃতীয় দাবি, নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে কমিশন সিভিল সার্জনকে শোকজ করেছে। নির্বাচনের সময় ইউনিয়নভিত্তিক ক্যাম্পের ব্যবস্থা করার বিষয়টি আচরণবিধি লঙ্ঘন কি না, তা তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
চতুর্থ দাবি, নির্বাচনের দিন ভোটগ্রহণ, ভোট গণনা ও ফলাফল প্রকাশ- এই তিনটি ধাপ সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। কোনো অনিয়ম দেখা দিলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে হবে।
হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, নির্বাচন কমিশন কেন্দ্রীয়ভাবে একটি মনিটরিং সেল গঠনের কথা জানিয়েছে। তবে শুধু মনিটরিং সেল গঠন বা কর্মকর্তাদের দায়িত্ব বাড়ালেই হবে না। মাঠপর্যায়ে সুষ্ঠু নির্বাচনের নিশ্চয়তা দিতে হবে।
তিনি বলেন, নির্বাচনের দিন কোনো ব্যত্যয় ঘটলে কমিশন তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেবে বলে আশ্বাস দিয়েছে। এ বিষয়ে তারা আশাবাদী। তবে আগামীকালের ভোটই হবে কমিশনের জন্য বড় পরীক্ষা। ওই নির্বাচনের ফলাফল ও সার্বিক পরিস্থিতি দেখেই দেশবাসী বুঝতে পারবে কমিশন কতটা স্বাধীন ও শক্তিশালী হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারছে। ঠাকুরগাঁওয়ের উপনির্বাচনে সুষ্ঠু ভোট নিশ্চিত করতে কমিশন ব্যর্থ হলেও এখানেই তাদের নির্বাচন ও রাজনীতির কার্যক্রম শেষ হয়ে যাবে না। তারা আন্দোলনের মাঠে রয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন হয়নি বলে তারা মনে করেন। এ ছাড়া সাত দফাসহ অন্যান্য দাবিতেও তারা আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন। আগামী ৩১ অক্টোবর লং মার্চের কর্মসূচির কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
১১-দলীয় জোটের সমন্বয়ক, ১১ দলীয় জোট আন্দোলনের মাঠে রয়েছে। ঠাকুরগাঁওয়ের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতির অবনতি হলে আন্দোলন আরও তীব্র হতে পারে। তবে তারা এমন পরিস্থিতি চান না। সরকারকে সতর্ক করে তিনি বলেন, এমন পরিস্থিতি যেন তৈরি না হয়, সেদিকে নজর দিতে হবে।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, ঠাকুরগাঁও-১ আসনে ভোটগ্রহণের উপযোগী পরিবেশ আছে কি না, তা নিয়ে তাদের অভিযোগ রয়েছে। তবে তারা নির্বাচন করার জন্যই প্রার্থী দিয়েছেন।
ভোটের পরিবেশ খারাপ হলে শেষ পর্যন্ত প্রার্থী নির্বাচনে থাকবেন কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা তো ইলেকশন করার জন্য প্রার্থী দিয়েছি। ইলেকশন না থাকার জন্য প্রার্থী দিইনি। পরিস্থিতি যদি ভোটের দিনও সেই পর্যায়ে যায়, তখন আমরা সিদ্ধান্ত নেব।’
তিনি বলেন, এখনো তাদের অভিযোগ রয়েছে। সেগুলো কমিশনের কাছে তুলে ধরা হয়েছে। আগামীকালই হবে বাস্তব পরীক্ষা। ভোটের দিনের সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করেই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন প্রসঙ্গে হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, নির্বাচন কমিশন প্রথমে একটি রোডম্যাপ দিয়েছিল। পরে একজন মন্ত্রীর বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে সেটি পরিবর্তন করা হয়েছে। কমিশন এ বিষয়ে নিজেদের ব্যাখ্যা দিয়েছে। কিন্তু তাদের মতে, মন্ত্রীর হস্তক্ষেপের কারণেই রোডম্যাপে পরিবর্তন এসেছে।
তিনি বলেন, ঠাকুরগাঁওয়ের উপনির্বাচনের পরিস্থিতি দেখেই বোঝা যাবে, নির্বাচন কমিশন ভবিষ্যতে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজন করতে কতটা সক্ষম। স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে, তা দূর করতে হবে। একই সঙ্গে নির্বাচন যেন সরকারের প্রভাবমুক্ত থাকে, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। এ বিষয়ে কমিশনের সঙ্গে তাদের আলোচনা হয়েছে। কমিশন তাদের কাছে পরামর্শ চেয়েছে। তারা কিছু পরামর্শ দিয়েছেন। এ নিয়ে পরবর্তী সময়ে আরও সুনির্দিষ্ট আলোচনা হবে।
তিনি আরও বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সময়সূচি সম্পর্কে তারা জানতে চেয়েছেন। মেয়র ও উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচন কবে হবে, সে বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়েছিল। কিন্তু কমিশন এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট সময় জানাতে পারেনি বলে তিনি উল্লেখ করেন।
কমিশনের বক্তব্য অনুযায়ী, এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত এলে তখন জানানো হবে। এ অবস্থায় স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সময়সূচি নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে বিভিন্ন এলাকায় ভোটার স্থানান্তরের অভিযোগ পাওয়ার কথা জানিয়ে হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, বিষয়টি তারা নির্বাচন কমিশনের কাছে তুলে ধরেছেন। কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ভোটার স্থানান্তরের তথ্য তাদের কাছে রয়েছে। কোনো এলাকায় অস্বাভাবিক হারে ভোটার স্থানান্তর হলে তা চিহ্নিত করার সুযোগ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে রেড ফ্ল্যাগ বা সতর্কসংকেত তৈরি হতে পারে।
তিনি বলেন, ভোটার স্থানান্তর নিয়ে তাদের উদ্বেগের বিষয়টি কমিশনকে জানানো হয়েছে। কোথাও অস্বাভাবিক হারে ভোটার স্থানান্তর হলে তা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। নির্বাচনের আগেই ভোটের পরিবেশ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায় কি না- সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, ভোটের আগের দিনও অনেক ক্ষেত্রে বোঝা যায়, পরদিন নির্বাচন কেমন হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, ২০১৪ সালের নির্বাচন থেকে শুরু করে পরবর্তী বিভিন্ন নির্বাচন ও সিটি করপোরেশন নির্বাচনে এজেন্টদের কেন্দ্রে না থাকা কিংবা এজেন্টদের কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়ার অভিযোগ ছিল। এসব অভিজ্ঞতা থেকে ভোটের আগেই নির্বাচনী পরিস্থিতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
এ প্রসঙ্গে তিনি ঝড়র পূর্বাভাসের উদাহরণ দিয়ে বলেন, ঝড় হওয়ার আগে কিছু লক্ষণ দেখা যায়। তবে পূর্বাভাস অনুযায়ী জ্বর হবেই, এমন নয়। একইভাবে নির্বাচনের আগের পরিস্থিতি দেখে ধারণা করা গেলেও ভোটের দিন পরিস্থিতি ভালো হতে পারে, আবার খারাপও হতে পারে।
আগামীকাল কেমন ভোট হতে পারে, এটা আমরা প্রেডিক্ট করতে পারি। সে প্রেক্ষিতে আজকে এখানে এসেছি। আবার এমনও হতে পারে, কালকে পরিস্থিতি ভালো হতে পারে, ডিটেরিয়েটও করতে পারে। তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন এবং পরবর্তী করণীয় নির্ধারণের প্রস্তুতিও রয়েছে। আগামীকালের নির্বাচন দেখেই শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
বৈঠকে ১১ দলীয় জোটের বিভিন্ন দলের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। তাদের মধ্যে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারী, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব তাফাজ্জল হোসেন মিয়াজী, ঢাকা-১৬ আসনের সংসদ সদস্য অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল আবদুল বাতেন, লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, নেজামে ইসলাম পার্টির সিনিয়র নায়েবে আমির আবদুল মাজেদ আতহারী, জাগপার সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ইকবাল, এবি পার্টির যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট আবদুল্লাহ আল মামুন রানা, এলডিপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বিল্লাল মিয়াজী, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির ইঞ্জিনিয়ার শহিদুল আলম এবং খেলাফত আন্দোলনের মহাসচিব মাওলানা মুফতি ফখরুল ইসলামসহ জোটের নেতারা ছিলেন।
ডেস্ক/আ.আ
মন্তব্য করুন: